গল্প: শেষ ঠিকানা
বিস্তারিত জানতে এখানে ক্লিক করুন।
রাহুল ছোটবেলায় মায়ের আঁচল ধরে হাঁটতে শিখেছিল। বাবা তাকে স্কুলে নিয়ে যেতেন কাঁধে তুলে। সংসারে টানাটানি ছিল, তবু মায়ের মুখে কখনো অভিযোগ দেখেনি সে। বাবা অতিরিক্ত কাজ করে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন, মা নিজের গয়না বিক্রি করে তাকে শহরের ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়েছিলেন।
রাহুল বড় হয়েছে, বিদেশে পড়তে গেছে, চাকরি পেয়েছে। তখনো প্রতি সপ্তাহে ফোন আসত —
— "মা, চিন্তা কোরো না, তোমাদের খুব বড় বাড়ি কিনে দেব।"
— "বাবা, একদিন নিয়ে আসব তোমাদের আমার কাছে।"
কিন্তু দিন পেরিয়ে গেল। কথা হারিয়ে গেলো।
ফোন আসত, তবে সংখ্যায় কম। মায়ের জিজ্ঞাসু গলা, বাবার স্তব্ধতা — সবই ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
একদিন রাহুল ঠিক করল — মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবে। ভালো জায়গা। সব সুবিধা আছে। অন্তত মনে হবে, দায়িত্ব পালন করেছে।
সেইদিন বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে মা বলেছিলেন,
— "তুই যখন ছোট ছিলি, জ্বর হলে সারারাত তোর মাথায় জলপট্টি দিয়েছি। তোকে তো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাইনি রে বাবা।"
বাবা কিছু বলেননি। শুধু পুরনো লাঠিটা টিপে ধীরে ধীরে উঠেছিলেন। চোখের কোনা ভিজে ছিল।
তারা গাড়িতে চেপে বসেছিলেন, বাড়ির দিকে শেষবারের মতো তাকিয়েছিলেন —
ঝরা পাতার মতো নিঃশব্দ এক বিদায়।
বৃদ্ধাশ্রমে দিনগুলো চলতে লাগলো। মা সকালবেলা চুপিচুপি মাটির দিকে তাকিয়ে থাকতেন। মাঝে মাঝে মাটির ওপর আঙুল দিয়ে লিখে রাখতেন — "রাহুল"।
বাবা এক কোণে বসে পুরনো ঘড়ি খুলে দেখতেন — ঠিক কখন রাহুল ফোন করবে।
দিন পেরিয়ে সপ্তাহ, মাস...
একদিন মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। শেষ মুহূর্তে তিনি বৃদ্ধাশ্রমের সেবিকাকে বলেছিলেন —
— "আমার ছেলেটাকে একবার দেখতে পারি?"
সেবিকা অনেক চেষ্টা করেছিল, ফোন দিয়েছিল।
রাহুল বলেছিল,
— "আমি খুব ব্যস্ত। মিটিং শেষ হলে চেষ্টা করব।"
মা চোখ বন্ধ করে মৃদু হাসলেন।
— "ঠিক আছে। দেখা না হলে, মনে মনে দেখব।"
সেদিনই তিনি চুপচাপ চলে গেলেন — ছেলেকে একটিবার না দেখেই।
রাহুল এসেছিল অনেক পরে। বৃদ্ধাশ্রমের করিডরে দাঁড়িয়ে, মা-বাবার খালি বিছানা দেখে এক অদ্ভুত হাহাকার অনুভব করেছিল।
বিছানার পাশে একটা পুরনো খাতা পড়ে ছিল।
খোলার পর দেখল —
মা প্রতিদিন সেখানে লিখে রেখেছিলেন —
— "আজও রাহুল আসেনি। আসবে। একদিন আসবেই।"
রাহুল হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল।
কিন্তু তখন আর কোনো হাত বাড়িয়ে তার কান্না মুছিয়ে দেওয়ার মতো ছিল না।
কেবল নিস্তব্ধ আকাশ আর ফাঁকা বিছানার মাঝখানে রয়ে গেল তার অতৃপ্ত ভালোবাসার আক্ষেপ।
মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম

No comments:
Post a Comment